শারমীন সাধনা সাব্বিরের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের কারিগর আকিজ মেডিকেল কলেজ

শারমীন , সাধনা, সাব্বির। তিন মেধাবীর জীবনের গল্পটা একই রকম। যে পরিবারে তারা বেড়ে উঠেছে সেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। লেখাপড়াই যেখানে সোনার হরিণ- সেখানে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখা তো রীতিমত বিলাসিতা! কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন এখন আর স্বপ্ন নয়- বাস্তব রূপ নিতে চলেছে। রিকশা চালক,দিনমজুর আর পিয়নের সন্তান এই পরিচয়ের চেয়ে বড় তারা এখন -মেডিকেল শিক্ষার্থী। মেধাবীদের খুঁজে এনে ডাক্তার হওয়ার সে স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে এসেছে খুলনার আদ-দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজ। দরিদ্র এই পরিবারগুলোতে এখন তাই হাসির ঝিলিক। দু:খ বেদনার ক্ষত সেরে আনন্দে উদ্বেলিত তিন পরিবার। আনন্দিত এলাকাবাসীও। নি:খরচায় ছেলে-মেয়েদের পড়াতে পেরে অভিভাবকরা বলছেন, এতদিন ওদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। এখন বুক থেকে ভার কমে গেছে।
আর সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীরা বলছেন, আদ-দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পেরে তারা ভীষন খুশি। এতে তাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। অদম্য মেধাবী তিন শিক্ষার্থীর গল্পটা লিখেছেন,তারিকুল ইসলাম মুকুল।
শারমিন আক্তার
দরিদ্র্যতাসহ নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে অবশেষে মেডিকেলে ভর্তি হতে পেরেছেন শারমিন আক্তার। রিক্সাচালক বাবা ও শারমিনের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে খুলনার আদ-দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজ। অদম্য এ মেধাবীর মেডিকেল কলেজে পড়ার সকল খরচ বহনের দায়িত্ব নিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
সুন্দর নিরিবিলি পরিবেশে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলতি বছরে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারায় ভীষন খুশি শারমিন আক্তার ও তার বাবা হারুন-অর-রশীদ।
খুলনা-যশোর মহাসড়কের পাশের আদ-দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কথা হয় বাবা ও মেয়ের সাথে।
এ সময় শারমিনের বাবা হারুন-অর-রশীদ বলেন, আমার জায়গা জমি কিছুই নেই। খুলনা মহানগরীর ছোট বয়রা মসজিদ বাড়ী রোডে পরের জায়গায় ঘর তুলে থাকি। একটা ভাঙ্গা রিক্সা চালিয়ে কোন মতে সংসার চালাই। শরীর অসুস্থতার কারণে অনেক দূরে রিক্সা চালাতে পারি না। মেডিকেলের আসে পাশে রিক্সা চালানোর সময় অনেক শিক্ষার্থী ও ডাক্তারের সাথে আমার পরিচয় হয়। তারা বিভিন্ন সময় আমার মেয়ের পড়া লেখার খোঁজ খবর নেয়। আমি তাদের জানাই মেয়েটার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন কিন্তু দারিদ্রতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তারা আমাকে আকিজে দারিদ্র কোঠার কথা বলেন। সামান্য অকটু লেখা পড়া জানি। সে হিসেবে আমি পেপার পত্রিকায় পড়ে জানতে পারি ৫ ভাগ কোঠা আছে এ মেডিকেল কলেজে।
তিনি আরও বলেন, আমি এসে যোগাযোগ করলে তারা কাগজপত্র জমা দিতে বলেন। জমা দেওয়ার পর আমাদের জানানো হয় ভাইবা হবে । ভাইবার দিন আসলে তারা আমার আয় ব্যয়সহ সব খোঁজ খবর নেয়। এবং দরিদ্র কোঠায় ভর্তি নেয়।
শারমিন আক্তার বলেন, সরকারি মেডিকেলে চান্স না পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। অনেক টেনশনের মধ্যে ছিলাম। দ্বিতীয় বার পরীক্ষা দিয়েছি। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা শেষ কোথাও ভর্তি হতে পারিনি। অবশেষে আদ-দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পেরে আমি ভীষন খুশি এবং আল্লাহর কাছে অনেক শুকরিয়া। ছোটবেলা থেকে বাবা-মার স্বপ্ন ছিলো ডাক্তার হওয়ার। আমি সেই ভাবে পড়াশুনা করেছি।
তিনি আরও বলেন, আদ-দ্বীন আকিজ মেডিকেল আমাদের যে সুযোগ দিয়েছে তাতে আমরা তাদের কাছে চীর কৃতজ্ঞ। তারা সুযোগ না দিলে আমাদের স্বপ্ন পূরণ হতো না।
আবেগ আপ্লুত হয়ে শারমিন বলেন, অভাব আর অনটনের জীবনযুদ্ধে বেশ কয়েকটি বিজয় এসেছে আমার। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো এ মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পাওয়া।
তিনি জানান, বয়রা ডাক বিভাগীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পান। খুলনা সরকারী মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসিতে এ প্লাস পান। এমবিবিএসের রেজাল্টে স্ক্রর করেন ২৬৪.২৫। ৬২৫৮ পজিশন অর্জন করেন।
সাধনা বিশ্বাস
সাধনা বিশ্বাস :
বাবার অকাল মৃত্যুর পর মা হাল ধরেন সংসারের। গ্রামে ঝিয়ের কাজ তেমন একটা না থাকায় মা পরের জমিতে কামলা খেটে সংসার চালান। মেয়ের লেখা-পড়ার খরচ যোগার করেন। মায়ের অনেক কষ্টের ফসল আজকে সাধনা বিশ্বাস মেডিকেলের ছাত্রী।
সাধনা জানান, চলতি বছরে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হওয়ার চান্স পায় তিনি। কিন্তু অর্থের অভাবে তার স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যাচ্ছিল। সেই সময় স্বপ্ন পূরণে পাশে এসে দাঁড়ায় আদ-দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজ।
তিনি বলেন, সব সাফল্য যখন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিল তখন আদ-দ্বীন আমাকে মেধাবী ও দারিদ্র কোঠায় পড়ার সুযোগ করে দেয়। আমি তাদের কি বলে কৃতজ্ঞতা জানাবো তার ভাষা আমার জানা নেই। সরকারি মেডিকেলে চান্স না পেয়ে ভেবেছিলাম আমার মায়ের পক্ষে তো বেসরকারি মেডিকেলে পড়ার খরচ চালানো সম্ভব হবে না। আমার স্বপ্ন বুঝি আর পূরণ হলো না। আদ-দ্বীন কলেজ আমার ও মায়ের স্বপ্ন পূরণ করছে।
সাধনা বলেন, আমি যশোরের বাঘারপাড়া থানার বাকড়ী গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ে । আমার কোন ভাই বোন নেই। বাবা লক্ষন বিশ্বাস অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। আমি চাই চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করতে। যাতে কেউ বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়। ছোট বেলা থেকেই ইচ্ছা ছিলো ডাক্তার হবো।
তিনি জানান, নড়াইলের গুয়াখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে এ প্লাস পান। যশোরের বাঘারপাড়ার ভাঙ্গড়া আদর্শ ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে এ প্লাস পান। এমবিবিএসের রেজাল্টে স্ক্রর করেন ২৬৪। ৬৪৫৪ পজিশন অর্জন করেন।
জীবনযুদ্ধে হার না মানা যোদ্ধা সাধনার মা উল্লাসী বিশ্বাস বলেন, কষ্ট কইরে মেয়েডারে মানুষ কইরেছি। তার একটা সুযোগ সুবিধা অইছে ভালো লাগছে। নিজের সামান্য জমি আছে। তাতি এক ফসল হয়। দুইডা গরু আছে। মেয়ের পড়া লেহার খরচ চালাতি অন্যের জমিতে কামলার কাজ করি। মাঠে ঘাটে কাজ কইরে টুক টাক দিন চইলে যায়।
তিনি জানান, ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষার সময় সাধনার বাবা মারা যায়। ওর মাত্র তিনটি পরীক্ষা হয়েছিলো তখন। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। তারপরও মেয়েটি সেই শোক সামলে ভালো রেজাল্ট করে। কিন্তু অর্থের অভাবে মেয়ের ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা পূরণ হচ্ছিলনা। তাকে সে সুযোগ দিয়েছে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ। যারা তার মেয়েকে ডাক্তার হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে তাদের প্রতি তিনি চির কৃতজ্ঞ।
মো. সাব্বির হুসাইন
মো. সাব্বির হুসাইন :

পরিবারে অনেক অভাব থাকা সত্বেও কখনও পড়া লেখার উপর তার প্রভাব পড়তে দেইনি। হাফেজি শেষ করে দাখিল ও আলীম পরীক্ষায় ঝালকাঠী এন এস কামিল মাদরাসা থেকে ভালো ফলাফল করি। আমার স্বপ্ন ছিল পড়াশুনা করে ডাক্তার হবো। দারিদ্রতা তার জন্য বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। অফিস পিয়ন বাবার পক্ষে ডাক্তারি পড়ানোর বিশাল খরচ চালানো কোনভাবে সম্ভব না মো. সাব্বির হুসাইনের।

সাব্বির জানান, চলতি বছরে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হওয়ার চান্স পায় তিনি। কিন্তু অর্থের অভাবে ভর্তি হতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে জানতে পারলেন দরিদ্র ও মেধাবী কোঠায় ভর্তির সুযোগ আছে আদ-দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজে। কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে তারা আমার পারিবারিক অবস্থা শুনে ও ফলাফল দেখে বিনা খরচে পড়ার সুযোগ করে দিলেন।

তিনি বলেন, আদ-দ্বীন আমাকে মেধাবী ও দারিদ্র কোঠায় পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আমি ও আমার পরিবার তাদের কাছে আজীবন ঋণী।

সাব্বির জানান, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে দাখিলে গোল্ডেন এ প্লাস ও আলীমে ৪.৮৮ পয়েন্ট পাই। এমবিবিএসের রেজাল্টে তিনি স্ক্রর করেন ২৬৩.২৫। ৭০১৪ পজিশন অর্জন করেন। তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কুমিরা গ্রামে। বাবা মো. মহিউল ইসলাম সাতক্ষীরা সার্কিট হাউজের এমএলএস। তিন ভাই বোনের মধ্যে বড় বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ছোট বোন ১০ শ্রেণীর ছাত্রী।

তিনি বলেন, সরকারি মেডিকেলে চান্স না পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। ভীষন চিন্তায় ছিলাম কি হবে। অবশেষে আদ-দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পেরে অনেক খুশি।

সাব্বিবের বাবা মহিউল ইসলাম বলেন, অনেক অভাব থাকা সত্বেও তিন ছেলে মেয়ে সব কিছু ভুলে গিয়ে পরীক্ষায় ভালো ফল এনেছে। বড় মেয়েকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি। ছেলেটা মেডিকেলে চান্স পেয়েও ভর্তি করতে পারছিলাম না। সামান্য অফিস পিয়ন হয়ে আমার পক্ষে বেসরকারি মেডিকেলে পড়ানো কোনভাবে সম্ভব নয়। আদ-দ্বীন কলেজের স্যারদের সহযোগিতা না পেলে আমার ছেলেকে এখানে ভর্তিও করতে পারতাম না। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নও পূরণ হতো না। এজন্য তাদের প্রতি আমার পরিবার চির কৃতজ্ঞ থাকবে।

তিনি জানান, তার সম্পদ বলতে শুধু বসতভিটা টুকু। এ ছাড়া আর কোনো জায়গাজমি নেই। অর্থকষ্টের মধ্যেও অদম্য আগ্রহে ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া করছে। তাদের এ সাফল্যে আমি অনেক সুখী।
আদ-দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ড. পরিতোষ কুমার রায় বলেন, দক্ষ চিকিৎসক তৈরির দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলছে কলেজটি। অনেকেরই সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয় না। আবার বেসরকারিতে চান্স পেয়েও অর্থের অভাবে অনেকেই ডাক্তার হতে পারেন না। সেই সব দরিদ্র ও মেধাবীদের বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ রয়েছে এখানে। এ বছর সাব্বিরের মতো তিনজন দরিদ্র ও মেধাবী কোঠায় ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।


Share this news to social network :
Leave a reply